Search This Blog

Theme images by MichaelJay. Powered by Blogger.

Blog Archive

Wednesday, December 7, 2016

প্রস্তাবনা (প্রণমামি শ্রীদুর্গে নারায়ণি)

প্রস্তাবনা


প্রণমামি শ্রীদুর্গে নারায়ণি


   গৌরি শিবে সিদ্ধিবিধায়িনি।


মহামায়া অম্বিকা আদ্যাশক্তি


   ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষ-প্রদায়িনি।।


শুম্ভনিশুম্ভ-বিমর্দিনি চন্ডি


   নমো নমঃ দশপ্রহরণধারিণি।।


দেব সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়-বিধাত্রি


   জয় মহিষাসুরসংহারিণি।।


যুগে যুগে দনুজদলনী মহাশক্তি


   যোগনিদ্রা মধুকৈটভনাশিনি


বেদ-উদ্ধারিণি মণি-দ্বীপবাসিনি


   শ্রীরাম অবতারে বরাভয়দায়িনি।।


  


তন্ত্রে শ্রীমহাকাল বলিতেছেন: ‘মা ব্রহ্মময়ী! তুমি চিন্তার অতীত হইয়াও সাকার শক্তিস্বরূপা। তুমি প্রতি জীবে একমাত্র সত্ত্বমূর্তিতে অধিষ্ঠান করিতেছ। তুমি সত্ত্বাদি গুণের অতীতা – নির্গুণা; রাগাদি দ্বন্দ্বরহিতা – কেবলমাত্র অনুভবের সামগ্রী। মা! তুমি পরব্রহ্মরূপিণী!


যিনি আদ্যাশক্তি, তিনিই পরমাত্মা। অগ্নি এবং তাহার দাহিকা শক্তি যেমন অভিন্ন, জল ও তাহার শীতলতা যেমন অভিন্ন, পরমাত্মা ও আদ্যাশক্তিও তেমনই অভিন্ন।


আদি-অনন্তহীন কালের বক্ষে লীলা করেন বলিয়া তিনি কালী। বিশ্বের সকল কিছুকে আকর্ষণ করেন বলিয়া তিনি কৃষ্ণ। তিনিই শিব, তিনিই রাম, তিনিই হ্লাদিনী শক্তি রাধা। বিশ্বের সকল জড়-জীব বিভিন্ন নামে তাঁহাকেই উপাসনা করে। সকল নামের নদী – ওই পরমাত্মারূপিণী মহাসাগরে গিয়া মিলিয়াছে – এক কথায় তিনি সর্বনাম। যিনি নির্গুণা, নিরাকার, চৈতন্যরূপিণী, কেবল অনুভব-সিদ্ধা, তাঁহাকে কোন নামে ডাকিব? তিনিই আদি পিতা, তিনিই আদি মাতা, অথচ তিনি পুরুষও নন, নারীও নন।


জীব যখন তাঁহাকে পিতা, স্বামী, সখা পুত্র-রূপে উপাসনা করে, তখন তিনি পুরুষরূপে দেখা দেন। মাতা বলিয়া, কন্যা বলিয়া স্তুতি করে, তখন তিনি নারীরূপে আবির্ভূতা হন। যে যোগী অরূপের পিয়াসি, তাহাকে তিনি দেখা দেন জ্যোতিঃরূপে, চিন্ময়রূপে। রূপ অরূপে লয় হইতেছে, আবার অরূপ রূপে মূর্তি পরিগ্রহ করিতেছে।– ইহাই তাহার সৃষ্টি প্রলয়-লীলা। বরফ গলিয়া জল হইতেছে, জল বাষ্পে পরিণত হইতেছে – বাষ্প মেঘ হইয়া বৃষ্টিধারায় গলিয়া পড়িতেছে। আবার সেই বৃষ্টিধারার জলরাশি বরফে পরিণত হইতেছে। যোগদৃষ্টিসম্পন্ন পূর্ণজ্ঞানীর কাছে যিনি সাকার, তিনিই নিরাকার। তাঁহার কাছে বুদ্ধের শূন্যবাদ ও শঙ্করাচার্যের পরিপূর্ণবাদ দুই-ই সত্য। এই আদ্যাশক্তি যখন সৃষ্টি করেন, তখন তাঁহার নাম ব্রহ্মা, যখন পালন করেন তখন তিনি বিষ্ণু, যখন সংহার করেন তখন তিনি রুদ্র। আবার যখন তিনি নিত্য রাস-লীলা করেন, তখন তিনি কৃষ্ণ। যখন তিনি কিছুই করেন না, তখন তিনি নিরাকার নির্গুণ পরব্রহ্ম।


অগ্নি অন্য জিনিষকে প্রকাশ করে, আলো ও উত্তাপ দান করে, আবার সেই অগ্নি দগ্ধও করে, অথচ অগ্নির কাহারও উপর প্রেম বা বিদ্বেষবুদ্ধি আছে এমন কথা কেহ বলিবেন না।আগুন যেমন নির্বিকার, তিনিও তেমনিই অগ্নির মতোই বিকারহীন। যে যে প্রয়োজনে তাঁহাকে ডাকে তিনি তাহার সেই প্রয়োজনই সিদ্ধ করেন। আগুনকে প্রদীপ করিয়া জ্বালাও, সে আলো দান করিবে; তাহাকে ভাত তরকারি রান্নার বা অন্য যে-কোনো কাজে নিযুক্ত কর, সে তাহাই করিয়া দিবে; আবার তাহাকে দিয়া ঘর জ্বালাও, সে নির্বিকারভাবে দগ্ধ করিবে। ভালো কাজে লাগাইলে অগ্নি মঙ্গলরূপে তোমার মঙ্গল সাধন করিবে, ঘর জ্বালাইলে তাহার শাস্তিও তোমায় ভোগ করিতে হইবে, লোকে ধরিয়া উত্তম-মধ্যম দিবে, উপরন্তু কারাগারে দিয়া ঘানি টানাইবে। আমরা সেই আনন্দরূপিণী মহাশক্তিকে এইরূপে আত্মারামের ঘর জ্বালাইবার কাজে লাগাইয়া সংসার-কারার ঘানি টানিয়া মরিতেছি জন্ম-জন্মান্তর ধরিয়া। বিষয়-বুদ্ধি-দোষ-দুষ্টু সাংসারিক লাভালাভের জন্য যাহারা তাঁহার তপস্যা করে, তাহাদের সে উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়, কিন্তু তাহার আনুষঙ্গিক দুঃখ-শোকাদিও ভোগ করিতে হয়। জ্ঞানীগণ দেখিলেন, অর্থ যশ সম্মান প্রতিষ্ঠা পুত্রাদি লাভে নিত্য আনন্দ বা শান্তি লাভ করা যায় না, তাই তাঁহারা কেবল তাঁহাকেই প্রার্থনা করিলেন। তাঁহার সঙ্গে এই এক হইয়া যাওয়াই মোক্ষ বা মুক্তি।


তিনি সকল জাতির উপাস্য প্রভু। বিশ্বের সকল জড়-জীব, প্রাণী, এই পৃথিবীর সকল ধর্ম, সকল জাতি, তাঁহার সৃষ্টি, তাঁহারই লীলার প্রকাশ। বিভিন্ন ধর্ম, বিভিন্ন জাতি তাঁহারই বৈচিত্র্যের প্রকাশ মাত্র। তিনি ইচ্ছা করিলে সকল মানুষ একদিনেই এক ধর্মাবলম্বী হইয়া যাইত। তিনি নানা রঙের ফুলে এই ধরণির বাগান সাজাইয়া রাখিয়াছেন। পৃথিবীর এই বহু ধর্ম, জাতি সেই রঙের খেলা মাত্র। পৃথিবীতে যখন তুফান, বন্যা, ঝড়, মহামারি, ভূমিকম্প আসে তখন সকল জাতি, সকল মানুষ একসাথেই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়; আবার তাঁহার বিগলিত করুণারূপে যখন শীতল বৃষ্টিধারা ঝরে তাহা জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে সকলের ঘরে ঘরে, সকল জাতির শিরে শিরে, সকল মানুষের মাঠ-ঘাটে বর্ষিত হয়। তাঁহার কাছে ভেদ জ্ঞান নাই। সকলেই যে তাঁহারই সৃষ্ট জীব! ঐকান্তিক আগ্রহে, একনিষ্ঠ তপস্যা দিয়া যে তাঁহাকে যেই নামে ডাকে তিনি তাহার কাছে সেই নামে সাড়া দেন। তিনিই পরমাত্মা, পরব্রহ্মরূপিণী আদ্যাশক্তি।

No comments:
Write comments

Interested for our works and services?
Get more of our update !