Search This Blog

Theme images by MichaelJay. Powered by Blogger.

Blog Archive

Tuesday, December 13, 2016

পঞ্চম দৃশ্য

পঞ্চম দৃশ্য



কাঞ্চনা :

পণ্ডিতমশাই ভয়ে পালিয়ে গেলেন বুঝি?



বিষ্ণুপ্রিয়া :

কার ভয়ে কাঞ্চনা?



কাঞ্চনা :

ধরা পড়ার ভয়ে।



বিষ্ণুপ্রিয়া :

দূর পোড়ামুখী! আচ্ছা ভাই কাঞ্চনা, তুই যখন তখন ওকে কঠিন কথা শুনাস, তোর ভয় করে না?



কাঞ্চনা :

একটুকুও না। ওই দুরন্ত পণ্ডিত মশাইটি চিরকাল আমার কাছে জব্দ। ছেলেবেলায় ওর ভয়ে আর সব মেয়ে অস্থির থাকত, কিন্তু আমায় দেখলেই উনি একেবারে কেচোঁটি হয়ে যেতেন। আমি বলতাম, তোমাদের সকলের সঙ্গে আড়ি, আর আমার সঙ্গে ভাব কেন? উনি বলতেন – ভক্তিকে ভগবান বড়ো ভয় করেন।



বিষ্ণুপ্রিয়া :

আচ্ছা, ভয় না হয় নাই করলি, পর-পুরুষ বলে লজ্জাও হয় না?



কাঞ্চনা :

ওঁর সঙ্গে আমার এই ভাব তো লুকানো ছাপানো নয় ভাই গৌর-প্রিয়া, সারা নদিয়ার লোক জানে ওঁর-আমার এই প্রীতি। আমি এই পাড়ারই মেয়ে। ছেলেবেলা থেকে ওঁকে দেখেছি, আজন্ম ওঁর সঙ্গে খেলেছি – আর আমাদের সে খেলায় লজ্জার কিছু ছিল না। তা ছাড়া ওঁকে আমার কখনও পর-পুরুষ বলে মনে হয় না, যখনই দেখেছি মনে হয়েছে উনি আমার পরম পুরুষ।



বিষ্ণুপ্রিয়া :

কাঞ্চনা, তোর মতো প্রেম যদি পেতাম –



কাঞ্চনা :

তাহলে ওঁর টোল এতদিন উঠিয়ে দিতে, আর রাতদিন উনি তোমারই পাঠশালায় প্রেমের পাঠ নিতেন, এই তো?



বিষ্ণুপ্রিয়া :

যাঃ! তোর সঙ্গে কথায় সরস্বতীও হার মেনে যায়–



কাঞ্চনা :

আর তোমার গুণে যে লক্ষ্মী স্বর্গে পালালেন।



বিষ্ণুপ্রিয়া :

তুই আমাকে সতিনের কথা মনে করিয়ে দিস কেন বল তো? আচ্ছা ভাই, দিদি খুব সুন্দরী ছিলেন, না? আর তোর সঙ্গে ওঁর বুঝি আমার চেয়েও বেশি ভাব ছিল?



কাঞ্চনা :

হ্যাঁ, সুন্দরী খুবই ছিলেন, তবে তোমার মতো না। ওঁর রূপে চাঁদের জ্যোতির চেয়ে সূর্যের তেজ বেশি ছিল। আর ভাব আমার এতটুকু ছিল না ওঁর সঙ্গে। যখন তখন ওঁর সঙ্গে ঝগড়া করতাম আর বলতাম – ঠাকরুন তুমি বৈকুণ্ঠের অধীশ্বরী। আমাদের ব্রজেশ্বরীর আসবার সময় হল, এবার তুমি সরে পড়ো না। এ রসের ব্রজে ব্রজেশ্বরী আর গোপিনিদের লীলা তুমি সইতে পারবে না। ঠাকরুন ভালো মানুষ, এই সব শুনে এবং বুঝে স্বর্গে চলে গেলেন।



বিষ্ণুপ্রিয়া :

কাঞ্চনা, কেন তুই ওঁর কথা এলেই ওঁকে ভগবান ভেবে কথা বলিস বল তো? তোর কথা শুনে আমার বড়ো ভয় হয়, সই। উনি যদি সত্যি সত্যিই ভগবান হয়ে যান তাহলে আমার কী অবস্থা হবে? আমি কোথায় দাঁড়াব? এক একবার আমারও মনে হয় উনি ছল করে মানুষ সেজে এসেছেন। ওঁর চোখ মুখ রূপ গুণ সব যেন বলে দেয়, আমি কারুরই নই – আমি একা।




কাঞ্চনা :

সত্যিই উনি পরম একাকী। আমাদের নিয়ে যে ওঁর এই লীলা এ ওঁর অসীম দয়া। তোমার কেন ভয় হয় গৌর-প্রিয়া জানি না, আমার কিন্তু ভয় হয় না। না, না, ভয় হয় বলেই তুমি ব্রজেশ্বরী, গৌরবক্ষ-বিলাসিনী। তুমি যে প্রেমময়ী তাই মধুর রূপ ছাড়া তাঁর অন্য রূপের কল্পনাও করতে পার না। আমরা সাধারণ মানুষ, – তাই দেবতাকে প্রিয়রূপে ভাবতে পারি না।



নিমাই :

যাক। আমি আর পণ্ডশ্রম করে মরি কেন, কাল থেকে টোলের ছাত্রদের বলে দেব, এই ঘরেই তারা ভাগবতের পাঠ নেবে।



কাঞ্চনা :

(চিৎকার করিয়া) মা দেখে যাও, আবার আমাদের জ্বালাতন করছে। তোমার ছেলেকে সামলাও, নইলে ভালো হবে না বলে দিচ্ছি।



শচীমাতা :

নিমাই! আবার কেন ওদের সঙ্গে লাগতে গেলে বাবা? ওরা দুটিতে আপনার মনে আলাপ করছে –



নিমাই :

আলাপ নয় মা প্রলাপ, একবার শুনে যাও না এসে।



শচীমাতা :

তা ওরা যা ইচ্ছা বকুক, তোর তাতে কাজ কী বাপু? আমি তখন থেকে কলা আর দুধ নিয়ে বসে আছি – আয় খেয়ে নে।



কাঞ্চনা :

মা, দুধকলা খাইয়ে ওঁকে পুষছ – বুঝবে যখন দংশন করে চলে যাবে।


[ বলিতে বলিতে প্রস্থান।]

No comments:
Write comments

Interested for our works and services?
Get more of our update !