Search This Blog

Theme images by MichaelJay. Powered by Blogger.

Blog Archive

Monday, December 12, 2016

ত্রয়োদশ খণ্ড

ত্রয়োদশ খণ্ড


[ভীষণ ঝড়বৃষ্টির মধ্যে বিদ্যাপতি ছুটিয়া চলিয়াছেন]


  



অনুরাধা :

ঠাকুর! ঠাকুর! ও পথে নয় এই দিকে, এই দিকে –এসো!



বিদ্যাপতি :

কে? কে তুমি চলেছ, আমার আগে দীপ জ্বালিয়ে – পথ দেখিয়ে?



অনুরাধা :

(তীক্ষ্ণ হাসি হাসিয়া) আমি বিষ্ণুমায়া!



বিদ্যাপতি :

অনুরাধা! অনুরাধা! নিয়ে চলো, নিয়ে চলো আমায় এই ঝড়বৃষ্টি কৃষ্ণরাতের অন্ধকারের মধ্য দিয়ে। নিয়ে চলো সেইখানে, যেখানে নেই মানুসের লালা-সিক্ত কামনা-সিক্ত ভালোবাসা। যেখানে আছে অনন্ত প্রেম, অনন্ত ক্রন্দন, অনন্ত অতৃপ্তি।



অনুরাধা :

এসো কবি, এসো সাধক! এই অশান্ত কৃষ্ণ নিশীথিনীর পরপারেই পাবে অশান্ত কিসোর চিরবিরহী শ্রীকৃষ্ণকে। ওই শোনো তাঁর মধুর মুরলীধ্বনি! (দূরে করুণ বাঁশির সুর)



বিদ্যাপতি :

অনুরাধা দাঁড়াও, দাঁড়াও! কে যেন আমার পা জড়িয়ে ধরেছে। উঃ রাধা! রাধা! আমায় কৃষ্ণ-সর্পে দংশন করেছে! জ্বলে গেল, জ্বলে গেল! সকল দেহ আমার বিষে জ্বলে গেল।



অনুরাধা :

(ছুটিয়া আসিয়া) ঠাকুর! ঠাকুর! দেখছ! ওই কৃষ্ণ-সর্পের মাথায় কী অপূর্ব মণি জ্বলছে! ও কৃষ্ণ-সর্প নয় ঠাকুর! তোমায় দংশন করেছে কৃষ্ণবিরহ। ওই বিরহিণী যাকে দংশন করে, তার মুক্তির আর বিলম্ব থাকে না। ঠাকুর! আমার শ্রীকৃষ্ণ! আমার গিরিধারীলাল! আমার প্রিয়তম! (শেষ কথাকটি বলিতে বলিতে অনুরাধা নিরুদ্দেশ হইয়া গেল।)



বিদ্যাপতি :

অনুরাধা! অনুরাধা! কোথায় নিরুদ্দেশ হলে তুমি? অনুরাধা! বুঝেছি, বুঝেছি তুমি বিষ্ণুমায়া! আমি মনে মনে চেয়েছিলাম গঙ্গায় ডুবে লছমীর স্পর্শ-পাপ স্খালন করতে – তাই তুমি ভুলিয়ে এনেছ গঙ্গার বিপরীত পথে – আলেয়ার আলো দেখিয়ে। বুঝেছি, তোমার মায়ায় ভুলেছিলাম আমি আমার আরাধ্যা দেবীকে। সেই পাপে আমার এই শাস্তি – এই সর্প-দংশন, এই ভীষণ মৃত্যু। – কিন্তু আমি যাব, আবার গঙ্গার পথেই যাব। যতক্ষণ শেষ নিশ্বাস থাকবে আমার, ততক্ষণ ছুটিব পতিতপাবনীকে স্মরণ করে। (ছুটিয়া চলিলেন)



রানি :

অনুরাধা! অনুরাধা! কেন আমায় ভাগরথীর কূলে ডেকে আনলি? বল মায়াবিনী তোর কী ইচ্ছা?



অনুরাধা :

তোমার জন্ম-জন্মান্তরের চাওয়াকে যদি চাও লছমী, তা হলে আমার সাথে এসো। পারবে আমার সাথে গঙ্গায় ঝাঁপ দিতে?



রানি :

তোর ইঙ্গিত বুঝেছি অনুরাধা। এই কলুষিত চিত্ত নিয়ে আমি শরণ নিয়েছিলাম আমার মুখর দেবতার – তাই দেবতা হলেন বিমুখ। তাই চাস এই পতিতপাবনীর জলে আমার এই পাপ-দেহের বিসর্জন। তবে তাই হোক। আমি যেন জন্মান্তরে – পরজন্মে, আমার বিদ্যাপতি – আমার নারায়ণকে আমার করে পাই। মা গো পতিতপাবনী।–


(দুই জনে গঙ্গার জলে ঝাঁপাইয়া পড়িলেন)



বিদ্যাপতি :

মা গো। পতিতপাবনী ভাগীরথী আমি তোর কোলের আশায় এত পথ ছুটে এলাম, তবু তোর কোলে আমার এই পাপ-তাপিত বিষ-জর্জরিত দেহ রাখতে পারলাম না মা! অঙ্গ আমার অবশ হয়ে এল। আর চলতে পারি না, মা! মাকে ডেকে, মৃত্যু উপেক্ষা করে সন্তান এল এতদূর পথ, আর তুই এতটুকু পথ আসতে পারলি না মা ভক্ত ছেলের ডাকে? মা! মা! মা গো! (দূরে গঙ্গার কলকল শব্দ) এ কী! এ কী! কোথা হতে ভেসে আসে দু-কূলপ্লাবী জোয়ারের কলকল সংগীত? তবে কি মা সন্তানের অন্তিম প্রার্থনা শুনেছিস! মা মকরবাহিনী সকল কলুষনাশিনী মা গো ! এ কী শীতল স্নিগ্ধ স্পর্শ তোর মা! আমার সকল মন-প্রাণ যেন জুড়িয়ে গেল। কাল-কেউটের দংশনজ্বালা জুড়িয়ে গেল মা তোর মাতৃ-করস্পর্শে। কে? কে? তুমি মা পরমেশ্বরী?



মা ভগীরথী :

বিদ্যাপতি! পুত্র আমার! আমার শাপ-ভ্রষ্ট সন্তান তুমি, আমি তোমার ডাকে তোমাকে কোলে তুলে নিতে এসেছি তোমার আপন ঘরে নন্দন – লোকে।


[লছমী ও অনুরাধা দূরে স্রোতে ভাসিয়া আসিতেছে – দূরে লছমীর গান নিকটতর হইতে লাগিল।]


  


সজনী, আজু শমন দিন হয়।


নব নব জলধর চৌদিকে ঝাঁজিল


প্রাণ দেহে নাহি রয়॥


বরষিছে পুন পুন      অগ্নি-দাহন যেন


জানিনু জীবন লয়।


  


[বিদ্যাপতির গান]


  



  

বিদ্যাপতি কহে, শুন শুন লছমী, মরণ মিলন মধুময়॥



লছমী :

কে? বিদ্যাপতি?



বিদ্যাপতি :

লছমী? তুমি?



অনুরাধা :

হ্যাঁ ঠাকুর! নিয়ে এসেছি আমি তোমার জীবন-মরণের সাথি লছমীকে। পবিত্র সুরধুনী-ধারায় স্নাত হয়ে তোমরা উভয়ে হয়েছ নির্মল। তাই মায়ের কোলে, মরণকে পুরোহিত করে হল তোমাদের মিলন। (বলিতে বলিতে অনুরাধা দূরে ভাসিয়া যাইতে লাগিল।)



লছমী :

অনুরাধা! সখী! আর তুই কি আমাদের ছেড়ে এমনি দূরে ভেসে যাবি?



অনুরাধা :

লছমী! সখী! আমি যেন জন্ম-জন্ম কালস্রোতে ভেসে এমনই যুগলমিলন দেখে মরতে পারি! (ভাসিয়া যাইতে যাইতে অনুরাধার কণ্ঠে গান ভাসিয়া আসিল–)


  


তোমার যাহাতে সুখ


তাহে আমার সুখ


সুন্দর মাধব হমার।


কোটি জনম যেন তুহার সুখের লাগি


ডারি দেই এ জীবন ছার॥


[ভীষণ স্রোত আসিয়া সকলকে ডুবাইয়া দিল।]


  


[যবনিকা পতন]

No comments:
Write comments

Interested for our works and services?
Get more of our update !