Search This Blog

Theme images by MichaelJay. Powered by Blogger.

Blog Archive

Tuesday, December 13, 2016

নবম দৃশ্য

নবম দৃশ্য


(বিষ্ণুপ্রিয়ার কক্ষ)


  



ঈশান :

দিদিলক্ষ্মী! বলি এমনি করে পড়ে পড়ে কাঁদলে কি এর কিনারা হবে? না, দাঠাউরকেও ঘরে বেঁধে রাখা যাবে? এই শালার পাঁচ ভূতে মিলে আমার সোনার ঠাকুরকে পাগল করে নাচিয়ে নিয়ে ফিরছে। দিদিলক্ষ্মী, যদি এজ্ঞে কর, তাহলে ওই বুড়ো ঈশানই ওই ভূতের বাপের ছেরাদ্দ করে ছাড়বে। যতসব আবাগের বেটা ভূত – এমন সোনার সংসার ছারেখারে দিলে গা!



বিষ্ণুপ্রিয়া :

ঈশান, কারুর দোষ নয়। দোষ আমার অদৃষ্টের। আমার ওঁকে ধরে রাখার ক্ষমতা নেই বলেই ওঁকে সংসারে রাখতে পারলাম না।



ঈশান :

বলি, তোমার ক্ষমতাটা কীসে কম হল, দিদিলক্ষ্মী ? থাকত আমার গিন্নি বেঁচে, তাহলে তোমায় এমন বুদ্ধি বাতলে দিয়ে যেত যে, দাঠাউর আর একদণ্ড তোমায় ছেড়ে যেতে পারত না।



বিষ্ণুপ্রিয়া :

দিদিমা বশীকরণ-মন্ত্র জানতেন নাকি ঈশানদা?



ঈশান :

মেয়েদের আবার মন্তর-ফন্তর লাগে নাকি, দিদিলক্ষ্মী, ভগবান তোমাদের সবচেয়ে বড়ো তুক দিয়েছেন, মান আর চোখের জল। এই দুই তুকের জোরে ভগবান পর্যন্ত কাবু, তা ঠাউর তো কোন ছার! যৈবনকালে আমি একবার রাগের মাথায় বাড়ি ছেড়ে দুদিনের জন্য পেলিয়েছিলাম, আর তাই পাড়ার লোকে রটিয়ে দিলে আমি সন্ন্যেসী হয়ে গিয়েছি। তারপর দিদিলক্ষ্মী, রাগ পড়লে বাড়ি যখন ফিরলাম, তখন সে যা কুরুক্ষেত্রকাণ্ড বাধল তা কইবার নয়। বেড়ালের লড়ুই দেখেছ?



বিষ্ণুপ্রিয়া :

দিদিমা কি আঁচড়াতে কামড়াতে পারতেন?



ঈশান :

তারও বাড়া দিদিলক্ষ্মী, তারও বাড়া। চুল ছিঁড়ে, কাপড় ছিঁড়ে, কেঁদে কেটে, মাথা কুটে – বলি তাতেও কি রাগ থামে – শেষে দিদিলক্ষ্মী আমায় ধরে দে ধনাদ্ধন দে ধনাদ্ধন।



বিষ্ণুপ্রিয়া :

বল কী ঈশানদা, দিদিমণি তোমায় মারতে লাগল? সোয়ামির গায়ে হাত তুললে?



ঈশান :

আরে দিদিলক্ষ্মী, উনাকে যে তখন ভূতে পেয়েছিল। উনার কি তখন জ্ঞানগম্মি ছিল? আর ও-বয়সে পরিবারের মার কি গায়ে লাগে? আমার মনে হতে লাগল যেন পুষ্পবিষ্টি হচ্ছে।



বিষ্ণুপ্রিয়া :

তুমি এইরকম পুরুষমানুষ, ঈশান দা? তোমায় ধরে মারলে আর তুমি চুপ করে সয়ে গেলে?



ঈশান :

দিদিলক্ষ্মী, কইলে পাপ হয়, নইলে দাঠাউরকে দু-একটা ঠোনাঠুনি দিয়ে দেখ দেখি ওঁর কেমন মিষ্টি লাগে। এই আশিটা বছর বয়স হল, তবু সেদিনের কথা মনে হলে সুখে আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠে। আমি বলি কী দিদিলক্ষ্মী, চোখের জলের অনুপান দিয়ে ওই ওষুধ অল্প মাত্রায় একটু দিয়ে দেখবে নাকি?



নিমাই :

কী ঈশান? কোন ওষুধের কথা বলছ? মাথায় তো মধ্যমনারায়ণ তেল মাখতে শুরু করেছ, এখন বাকি হাতে-পায়ে শিকল-বেড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা, তারই পরামর্শ আঁটছ বুঝি?



ঈশান :

এজ্ঞে, দাঠাউর! আমি দিদিলক্ষ্মীকে বলছিলাম, মধ্যমনারায়ণ তেল মাথায় না দিয়ে তোমার সঙ্গী ওই উনাদের মাথায় দিলে কাজ দিত। কী করি, বৈষ্ণব মানুষ, দিদিলক্ষ্মীও গো-বেচারি মুখচোরা মানুষ, নইলে ভূত তাড়াবার ওষুধ আমার কিছু জানা ছিল।



নিমাই :

কী ঈশানদা! ওঁরা ভক্ত লোক, ওঁদের নিন্দা করলে পাপ হয়।



ঈশান :

দাঠাউর! তোমায় তেনারা নারায়ণ বলেন, ভগবান বলেন। কিন্তু ভগবানের কি এই বিচার হল? আমি ছেলেবেলা থেকে তোমায় কোলেপিঠে নিয়ে মানুষ করলুম, তোমায় একদণ্ড না দেখলে আমার মনে হত যেন আকাশের সুয্যি নিভে গেছে। – যাক, আমার কথা না হয় বাদই দিলাম, তোমার অমন দয়াময়ী দুঃখিনী মা, এই বৈকুন্ঠের লক্ষ্মীর মতো বউ – এনারা তোমার কেউ নয়? আমরা ছাড়া বিশ্ব-সংসারের আর সবাই হল তোমার আপনার জন?



বিষ্ণুপ্রিয়া :

ছিঃ ঈশানদা, ওঁকে অমন করে বোলো না। উনি যাতে সুখী হন – আমার তাতেই সুখ।



ঈশান :

তুমি থামো দিদিলক্ষ্মী, আমি জন্মে থেকে এ বাড়ির চাকর, দাঠাউর তো দুধের ছেলে, ওঁর বাবা-মা পর্যন্ত কেউ আমাকে একদিনের জন্য একটা কথা বলতে পারেনি। আজ যদি রেগে দাঠাউর আমায় তাড়িয়ে দেয় –



নিমাই :

ওকী কথা বলছ ঈশান দা! তোমার পায়ের ধুলো পেলেও যে সে পরম ভক্ত হয়ে উঠবে – আমি তোমায় তাড়িয়ে দেব? তোমার পায়ে পড়ি, তুমি অমন কথা বোলো না –।



ঈশান :

হরেকিষ্ট! হরেকিষ্ট! দা ঠাউর, একী করলে তুমি? আমার পা ছুঁলে! কোটি জন্মেও যে আমার এ পাপের ক্ষয় হবে না। চিরটাকাল তুমি তোমার ধুলোমাখা পা নিয়ে আমার বুকে খেলা করেছ – ওই রাঙা পায়ের ধুলো পেয়ে চোখের জলে বুক ভেসে গেছে – হায় হরি – আজ তুমি এ কী করলে? যাই, দৌড়ে গঙ্গায় ডুব দিয়ে আসি।



  

(যাইতে যাইতে) হরেকিষ্ট, হরেকিষ্ট!

No comments:
Write comments

Interested for our works and services?
Get more of our update !