Search This Blog

Theme images by MichaelJay. Powered by Blogger.

Blog Archive

Sunday, November 13, 2016

শিউলিমালা - ৩

দেড় মাস ছিলাম শিলং-এ। হপ্তাখানেকের পরেই আমাকে হোটেল ছেড়ে প্রফেসর চৌধুরির বাড়ি থাকতে হয়েছিল গিয়ে। সেখানে আমার দিন-রাত্রি নদীর জলের মতো বয়ে যেতে লাগল। কাজের মধ্যে দাবা খেলা আর গান।


মুশকিলে পড়লাম – প্রফেসার চৌধুরিকে নিয়ে। তাঁর সঙ্গে দাবাখেলা তো আছেই – তাঁকে গান শেখানোই হয়ে উঠল আমার পক্ষে সব চেয়ে দুষ্কর কার্য।


শিউলিও আমার কাছে গান শিখতে লাগল। কিছুদিন পরেই আমার গান ও গানের পুঁজি প্রায় শেষ হয়ে গেল।


মনে হল আমার গান শেখা সার্থক হয়ে গেল। আমার কন্ঠের সকল সঞ্চয় রিক্ত করে তার কন্ঠে ঢেলে দিলাম।


আমাদের মালা বিনিময় হল না– হবেও না এ জীবনে কোনোদিন – কিন্তু কন্ঠ বদল হয়ে গেল! আর মনের কথা – সে শুধু মনই জানে!


অজিত বাধা দিয়ে বলে উঠল, ‘কন্ঠ না কন্ঠী বদল বাবা? শেষটা নেড়ানেড়ির প্রেম! ছোঃ!’


আজহার কিছু না বলে আবার সিগার ধরিয়ে বলে যেতে লাগল–


একদিন ভোরে শিউলির কন্ঠে ঘুম ভেঙে গেল। সে গাচ্ছিল–


‘এখন আমার সময় হল


যাবার দুয়ার খোলো খোলো।’


গান শুনতে শুনতে মনে হল – আমার বুকের সকল পাঁজর জুড়ে ব্যথা। চেষ্টা করেও উঠতে পারলাম না। চোখে জল ভরে এল।


আশাবরি সুরের কোমল গান্ধারে আর ধৈবতে যেন তার হৃদয়ের সমস্ত বেদনা গড়িয়ে পড়ছিল! আজ প্রথম শিউলির কন্ঠস্বরে অশ্রুর আভাস পেলাম।


ঠুং করে কীসের শব্দ হতেই ফিরে দেখি, শিউলি তার দুটি করপল্লব ভরে শিউলি ফুলের অঞ্জলি নিয়ে পূজারিনির মতো আমার টেবিলের উপর রাখছে। চোখে তার জল।


আমার চোখে চোখ পড়তেই সে তার অশ্রু লুকাবার কোনো ছলনা না করে জিজ্ঞাসা করল – আপনি কি কালই যাচ্ছেন?


উত্তর দিতে গিয়ে কান্নায় আমার কন্ঠ রুদ্ধ হয়ে এল। পরিপূর্ণ শক্তি দিয়ে হৃদয়াবেগ সংযত করে আস্তে বললাম – ‘হাঁ ভাই!’ আরও যেন কী বলতে চাইলাম। কিন্তু কী বলতে চাই ভুলে গেলাম।


শিউলি শিউলি ফুলগুলিকে মুঠোয় তুলে অন্যমনস্কভাবে অধরে কপোলে ছুঁইয়ে বলল, ‘আবার কবে আসবেন।’


আমি ম্লান হাসি হেসে বললাম, ‘তাও জানিনে ভাই! হয়তো আসব!’


শিউলি ফুলগুলি রেখে চলে গেল। আর একটি কথাও জিজ্ঞেস করল না।


আমার সমস্ত মন যেন আর্তস্বরে কেঁদে উঠল – ওরে মূঢ়, জীবনের মাহেন্দ্রক্ষণ তোর এই এক মুহূর্তের জন্যই এসেছিল, তুই তা হেলায় হারালি! জীবনে তোর দ্বিতীয়বার এ শুভ মুহূর্ত আর আসবে না, আসবে না।


এক মাস ওদের বাড়িতে ছিলাম। কত স্নেহ কত যত্ন, কত আদর। অবাধ মেলামেশা – সেখানে কোনো নিষেধ, কোনো গ্লানি, কোনো বাধাবিঘ্ন কোনো সন্দেহ ছিল না। আর এ সব ছিল না বলেই বুঝি এতদিন ধরে এত কাছে থেকেও কারুর করে কর-স্পর্শটুকুও লাগেনি কোনোদিন। এই মুক্তিই ছিল বুঝি আমাদের সবচেয়ে দুর্লঙ্ঘ্য বাধা। কেউ কারুর মন যাচাই করিনি। কোনো প্রশ্ন জিজ্ঞাসার কথাও উদয় হয়নি মনে। একজন অসীম আকাশ – একজন অতল সাগর। কোনো কথা নেই – প্রশ্ন নেই, শুধু এ ওর চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে আছে।


কেউ নিষেধ করলে না, কেউ এসে পথ আগলে দাঁড়াল না! সেও যেন জানে – আমাকে চলে আসতেই হবে, আমিও যেন জানি – আমাকে যেতেই হবে।


নদীর স্রোতই যেন সত্য – অসহায় দুই কূল এ ওর পানে তাকিয়ে আছে। অভিলাষ নাই – আছে শুধু অসহায় অশ্রু-চোখে চেয়ে থাকা।


সে চলে গেল টেবিলের শিউলিফুলের অঞ্জলি দুই হাতে তুলে মুখে ঠেকাতে গেলাম। বুঝি বা আমারও অজানিতে আমি সে ফুল ললাটে ঠেকিয়ে আবার টেবিলে রাখলাম। মনে হল, এ ফুল পূজারিনির – প্রিয়ার নয়। ভাবতেই বুক যেন অব্যক্ত বেদনায় ভেঙে যেতে লাগল।


চোখ তুলেই দেখি, নিত্যকার মতোই হাসিমুখে দাঁড়িয়ে শিউলি বলছে – ‘আজ আমায় গান শেখাবেন না?’


আমি বললাম – ‘চলো, আজই তো শেষ নয়।’


শিউলি তার হরিণ-চোখ তুলে আমার পানে চেয়ে রইল। ভয় হল বলে তার মানে বুঝবার চেষ্টা করলাম না।


ও যেন স্পর্শাতুর কামিনী ফুল, আমি যেন ভীরু ভোরের হাওয়া – যত ভালোবাসা, তত ভয়! ও বুঝি ছুঁলেই ধুলায় ঝরে পড়বে।


এ যেন পরির দেশের স্বপ্নমায়া, চোখ চাইলেই স্বপ্ন টুটে যাবে!


এ যেন মায়া-মৃগ – ধরতে গেলেই হাওয়ায় মিশিয়ে যাবে!


গান শেখালাম – বিদায়ের গান নয়। বিদায়ের ছাড়া আর সব কিছুর গান। বিদায় বেলা তো আসবেই – তবে আর কথা বলে ওর সব বেদনা সব মাধুর্যটুকু নষ্ট করি কেন?


সেদিনকার সন্ধ্যা ছিল নিষ্কলঙ্ক – নির্মেঘ – নিরাভরণ। আমি প্রফেসর চৌধুরিকে বললাম – আজকের সন্ধ্যাটা আশ্চর্য ভালোমানুষ সেজেছে তো! কোনো বেশভূষা নাই।


বলতেই মুখের কথা কেড়ে নিয়ে প্রফেসর চৌধুরি বলে উঠলেন – ‘সন্ধ্যা আজ বিধবা হয়েছে!’


এই একটি কথায় ওঁর মনের কথা বুঝতে পারলাম। এই শান্ত সৌম্য মানুষটির বুকেও কী ঝড় উঠেছে বুঝলাম। মনে মনে বললাম – তুমি অটল পাহাড়, তোমার পায়ের তলায় বসে শুধু ধ্যান করতে হয়! তোমাকে তো ঝড় স্পর্শ করতে পারে না!


বৃদ্ধ বুঝি মন দিয়ে আমার মনের কথা শুনেছিলেন। ম্লান হাসি হেসে বললেন – ‘আমি অতি ক্ষুদ্র, বাবা! পাহাড় নয়, বল্মীকস্তূপ! তবু তোমাদের শ্রদ্ধা দেখে গিরিরাজ হতেই ইচ্ছা করে!


আমি কিছু উত্তর দেবার আগেই শিউলি আমাদের সামনে এসে দাঁড়াল। হঠাৎ আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে পড়ল – ‘এই যে সন্ধ্যা দেবী!’ বলেই লজ্জিত হয়ে পড়লাম।


শিউলির সোনার তনু ঘিরে ছিল সেদিন টকটকে লাল রং-এর শাড়ি। ওকে লাল শাড়ি পরতে আর কোনোদিন দেখিনি। মনে হল, সারা আকাশকে বঞ্চিত করে সন্ধ্যা আজ মূর্তি ধরে পৃথিবীতে নেমে এসেছে। তার দেহে রক্ত-ধারা রং-এর শাড়ি, তার মনে রক্ত-ধারা, মুখে অনাগত নিশীথের ম্লান ছায়া! চোখ যেমন পুড়িয়ে গেল, তেমনই পুরবির বাঁশি বেজে উঠল।


শিউলির কাছে দু-একটা বাংলা গান শিখেছিলাম। আমি বললাম – ‘একটা গান গাইব?’ শিউলি আমার পায়ের কাছে ঘাসের উপর বসে পড়ে বলল – ‘গান!’


আমি গাইলাম-


‘বিবাহের রঙে রাঙা হয়ে এল


সোনার গগন রে?’


  


প্রফেসর চৌধুরি উঠে গেলেন। যাবার সময় বলে গেলেন, ‘বাবাজি, আজ একবার শেষ বার দাবা খেলতে হবে!’


চৌধুরি সাহেব উঠে যেতে আমি বললাম – ‘আচ্ছা ভাই শিউলি আবার যখন এমনই আশ্বিন মাস – এমনই সন্ধ্যা আসবে – তখন কী করব, বলতে পারো?’


শিউলি তার দু-চোখ ভরা কথা নিয়ে আমার চোখের উপর যেন উজার করে দিল। তার পর ধীরে ধীরে বলল, – ‘শিউলিফুলের মালা নিয়ে জলে ভাসিয়ে দিয়ো!’


আমি নীরবে সায় দিলাম – তাই হবে! জিজ্ঞাসা করলাম – ‘তুমি কী করবে!’
সে হেসে বললে, ‘আশ্বিনের শেষে তো শিউলি ঝরেই পড়ে!’


আমাদের চোখের জল লেগে সন্ধ্যাতারা চিকচিক করে উঠল।


রাত্রে দাবা-খেলার আড্ডা বসল! প্রফেসর চৌধুরি আমার কাছে হেরে গেলেন। আমি শিউলির কাছে হেরে গেলাম! জীবনে আমার সেই প্রথম এবং শেষ হার! আর সেই হারই আমার গলার হার হয়ে রইল!


সকালে যখন বিদায় নিলাম – তখন তাদের বাংলোর চারপাশে উইলো-তরু তুষারে ঢাকা পড়েছে!


আর তার সাথে দেখা হয়নি– হবেও না! একটু হাত বাড়ালে হয়তো তাকে ছুঁতে পারি, এত কাছে থাকে সে। তবু ছুঁতে সাহস হয় না। শিউলিফুল – বড়ো মৃদু, বড়ো ভীরু, গলায় পরলে দু-দণ্ডে আঁউরেআঁউরে : আড়ালে যাওয়া, শুকিয়ে যাওয়া। যায়! তাই শিউলিফুলের আশ্বিন যখন আসে – তখন নীরবে মালা গাঁথি আর জলে ভাসিয়ে দিই!

No comments:
Write comments

Interested for our works and services?
Get more of our update !