Search This Blog

Theme images by MichaelJay. Powered by Blogger.

Blog Archive

Sunday, November 27, 2016

সর্বহারা

সর্বহারা


সকলের তরে এসেছে যে-জন, তার তরে


‌‌পিতার মাতার স্নেহ নাই, ঠাঁই নাই ঘরে।


নিখিল ব্যথিত জনের বেদনা বুঝিবে সে,


তাই তারে লীলা-রসিক পাঠাল দীন বেশে!


আশ্রয়হারা সম্বলহীন জনগণে –


সে দেখিবে চির-আপন করিয়া কায়মনে –


বেদনার পর বেদনা হানিয়া তাই তারে


ভিখারি সাজায়ে পাঠাল বিশ্ব-দরবারে!


আসিল আকুল অন্ধকারের বুকে হেথাই।


আলোর স্বপন হেরিবে, আলোর দিশারি, তাই


নিখিল পিতৃহীনের বেদনা নিজ করে


মুছাবে বলিয়া – নিখিলের পিতা ধরা পরে


পাঠাইল তার বন্ধুরে করি পিতৃহীন,


দীনের বন্ধু আসিল সাজিয়া দীনাতিদীন।


পিতৃহীন সে শিশু পুনরায় মাতারে তার


হারাইল আজ! শোক-নদী হল শোক পাথার!


  


      *        *        *


হালিমার কোলে গত হয়ে গেল পাঁচ বছর


শশীকলা সম বাড়িতে লাগিল শশী-সোদর।


সহসা সেদিন শ্যাম প্রান্তরে নিষ্পলক


চাহিয়া অদূরে কী মেঘের ছায়া হেরি বালক


উতলা হইল ফিরিবার লাগি জননী-ক্রোড় ;


গগন বিহারী বিহগের চোখে নীড়ের ঘোর!


কত গ্রহ তারা কত মেঘ ডাকে নীলাকাশে,


বিহরি খানিক চপল বিহগ ফিরে আসে


আপনার নীড়ে! ভুলিতে পারে না মা-র পাখা,


আকাশের চেয়ে তপ্ততর সে স্নেহমাখা!...


কাঁদিতে লাগিল মরুপল্লির মাঠ ও বাট,


ভাঙিয়া গেল গো খেজুর বনের রাখালি নাট।


পাহাড়তলিতে দুম্বা শিশুরা চাহিয়া রয়,


তাহাদের চোখে আজ পাহাড়ের ঝরনা বয়।


হলিমার ঘরে আলো নিভে গেল দমকা বায়,


পুত্র কন্যা কাঁদিয়া কাঁদিয়া মূর্ছা যায়।


তবু তারে ছেড়ে দিতে হল! ভাঙি মেঘের বাঁধ


পলাইয়া গেল রাঙা পঞ্চমী তিথির চাঁদ!


আমিনার কোলে ফিরে এল আমিনার রতন


বৃদ্ধ মুত্তালিবের যষ্ঠি – যখের ধন!


স্কন্ধে তুলিয়া বালকে বৃদ্ধ এল কাবায়,


বেদিতে রাখিয়া বালকে খোদার আশিস চায়।


সাতবার তারে করাইল কাবা প্রদক্ষিণ


প্রার্থনা করে, ‘রক্ষ পিতা এ পিতৃহীন!’


আমিনা সাদরে হালিমায় কয়, ‘কী দিব ধন


আমার রতনে করিয়াছ কত শত যতন,


মনের মতন দিব যে অর্থ নাহি উপায়,


তবু বলো মোর যা আছে ঢালিব তোমার পায়।


আমি ধরেছিনু গর্ভে – তুমি যে ধরি বুকে


করেছ পালন – মোরা সহোদরা সেই সুখে।’


হালিমার চোখে বয়ে যায় জমজম পানি,–


মোহাম্মদেরে ধরে কাঁদে নাহি সরে বাণী।


কাঁদিয়া কহিল মোহাম্মদেরে, ‘জাদু আমার,


তুই দে আমায় আমার প্রাপ্য পুরস্কার!


আমিনা-বহিন জানে না তো তোরে কেমন সে


রাখিয়াছি বুকে দুখ দিয়ে না সে ভালোবেসে!’


ছুটিয়া আসিল বালক ফেলিয়া মায়ের কোল,


কন্ঠ জড়ায়ে হালিমারে বলে মধুর বোল।


চুমু দিয়ে কয়, ‘মা গো, এই লহ পুরস্কার।’


হালিম মুছিয়া আঁখি, কয়, ‘কিছু চাহি না আর!


সব পাইয়াছি আমিনা, ইহার অধিক বোন,


পারিবে আমারে দিতে জহরত মানিক কোন।’


জননীর কোল জুড়াল আবার নব সুখে,


চোখের অশ্রু শিশু হয়ে আজ দুলে বুকে!...


পুন রবিয়ল আউওল চাঁদ এল ফিরে,


এবার চাঁদের ললাট আসিল মেঘে ঘিরে।


কনক-কান্তি বালক খেলায় আঙিনায়,


আমিনার মনে স্বামী-স্মৃতি নিতি কাঁদিয়া যায়।


ফিরিয়া ফিরিয়া আসিল সেই সে চান্দ্র মাস


আবদুল্লাহ গেল পরবাসে ফেলিয়া শ্বাস,


আর ফিরিল না – মদিনায় নিল চিরবিরাম!


আমিনার চোখে ‘সোবেহ্‌সাদেক’সোবেহ্‌সাদেক : অতি প্রত্যুষ। হইল ‘শাম’শাম : সন্ধ্যা।!


মদিনার মাটি লুকায়ে রেখেছে স্বামীরে তার,


যাবে সে খুঁজিতে যদি বা চকিতে পায় ‘দিদার’দিদার : দর্শন।


যে কবরতলে আছে সে লুকায়ে, সেই কবর


জিয়ারতজিয়ারত : মৃতের আত্মার কল্যাণ কামনায় প্রার্থনা। করি পুছিবে স্বামীরে তার খবর।


মৃত্যু-নদীর উজান ঠেলিয়া কেহ কি আর


ফিরিতে পারে না ওপার হইতে পুনর্বার?


দেখিবে ডুবিয়া – নাই যদি ফিরে, ভয় কী তায়?


হয়তো একূলে হারায়ে ওকূলে প্রিয়রে পায়!


আহ্‌মদে লয়ে আমিনা-মা চলে মদিনাধাম,


জানে না, সে চলে লভিতে স্বামীর সাথে বিরাম।


জানে না সে চলে জীবনপথের শেষ সীমায়,


ওপার হইতে চিরসাথি তারে ডাকিছে ‘আয়!’


কত শত পথ-মঞ্জিল মরু পারায়ে সে


দাঁড়াল স্বামীর গোরের শিয়রে আজ এসে!


বুঝিতে পারে না বালক, কেন যে জননী হায়


কবর ধরিয়া লুটায় আহত কপোতী প্রায়!


বালকে বক্ষে জড়াইয়া বলে, ‘ওঠো স্বামী,


তোমার অ-দেখা মানিকে এনেছি দিতে আমি!’


মা-র দেখাদেখি কাঁদিল বালক, চুমিল গোর,


বলে – ‘মা গো তোর চেয়ে ছিল ভালো পিতা কি মোর?


তোমার মতন ভালোবাসিত সে? তবে কেন


না ধরিয়া কোলে মাটিতে লুকায়ে রয় হেন?’


কী বলিবে মাতা! ক্রন্দনরত বালকে তার


বক্ষে ধরিয়া চুম্বে কবর বারংবার!


মাখিয়া স্বামীর কবরের ধূলি সকল গায়


মক্কার পথে আবার আমিনা ফিরিয়া যায়।


ফিরে যেতে মন সরে না ছাড়িয়া গোরস্থান,


তবু যেতে হবে – এ বালক এ যে স্বামীর দান!


মরুপথে বাজে উটচালকের বংশী সুর,


মনে হয় যেন সেই ডাকে তারে ব্যথা-বিধুর!


মনে মনে বলে – ‘অন্তর্যামী! শুনেছি ডাক,


তুমি ডাকিয়াছ – ছিঁড়ে যাব বন্ধন বেবাক।’


কিছুদূর আসি পথমঞ্জিলে আমিনা কয় –


‘বুকে বড়ো ব্যথা, আহ্‌মদ, বুঝি হল সময়


তোরে একলাটি ফেলিয়া যাবার! চাঁদ আমার,


কাঁদিসনে তুই, রহিল যে রহমতরহমত : করুণা। খোদার!’


বলিতে বলিতে শ্রান্ত হইয়া পড়ি ঢলি,


ফিরদৌসেরফিরদৌস : স্বর্গ। পথে মা আমিনা গেল চলি’!


বজ্র-আহত গিরি-চূড়া সম কাঁপি খানিক


মা-র মুখে চাহি রহিল বালক নির্নিমিখ!


পূর্ণিমা চাঁদে গ্রাসে রাহু এই জানে লোকে,


গরাসিল রাহু আজ ষষ্ঠীর চন্দ্রকে!


  


      *        *        *


বাজ-পড়া তালতরুসম একা বৃন্তহীন


 দাঁড়ায়ে বৃদ্ধ মুত্তালিব


আকাশ-ললাটে ললাট রাখিয়া নিশি ও দিন


 দেখায় তাহার বদ-নসিব।


আবদুল্লাহ্ গিয়াছিল, আমিনা আজ


 মোহাম্মদেরে দিয়া জামিন!


দরদ-মুলুকে বাদশাহ শিরে বেদনা আজ


 উন্নত শির বীর প্রাচীন,


ফরিয়াদ করে আকাশে তুলিয়া নাঙ্গা শির,


 ‘ওরে বালক কেন এলি হেথায়,


নাহি পল্লব-ছায়া পোড়া তরু মরুর তার


 কী দিয়া আতপ নিবারি হায়!


খাক হয়ে গেছে মরু-উদ্যান, বালুর উপরে বালুর স্তূপ


 রচেছে সেখানে কবর গাহ্


গুল নাই, কেন পোড়াইতে পাখা এলি মধুপ,


 শোকপুরী – আমি শাহানশাহ!


নাহি পল্লব-শাখা নাই একা তালতরু,


 উড়ে এলি সেথা বুলবুলি!


ঊর্ধ্বে তপ্ত আকাশ নিম্নে খর মরু


 ‘বিয়াবানে’বিয়াবান : মরুভূমি। এলি গুল ভুলি।’


যত কাঁদে তত বুকে বাঁধে আরও, কে রে কপট


 মায়াবী খেলিছে খেলা এমন,


প্রাচীন বটের সারা তনু ঘিরি, জটিল জট


 আঁকড়িয়া আছে পোড়া কানন।


ব্যাধ-ভয়াতুর শিশু-পাখিসম তবু বালক


 জড়াইয়া পিতামহেরে তার,


জননীর চলে-যাওয়া পথে চাহে নিষ্পলক


 ডাগর নয়ন ব্যথা বিথার।


যে ডাল ধরে সে সেই ডাল ভাঙে, অ-সহায়


 তবু আর ডাল ধরে আবার,


তৃণটিও ধরে আঁকড়ি স্রোতে যে ভাসিয়া যায়


 আশা মনে – যদি পায় কিনার।


শোকে ঘুণধরা জীর্ণ সে শাখা, তাই ধরি


 রহিল বালক প্রাণপণে,


জানে না, এ ডালও ভাঙিয়া পড়িবে শিরোপরি


 আবার ঘোর প্রভঞ্জনে।


পাখা মেলে এল শোকের বিপুল ‘সি-মোরগ’


 কালো হল ধরা সেই ছায়ায়,


দু-বছর পরে – পিতামহ চলি গেল স্বরগ


 ছিঁড়ি বন্ধন মোহমায়ায়।


ওড়ে কালো মেঘ মক্কার শিরে শকুনিপ্রায়


 ছিন্ন জটায়ু-পাখা যেন,


আট বছরের বালকের বাহু শক্তি তায়


 বাঁধিয়া রাখিবে নাই হেন।


আরবের বীর মক্কার শির মুত্তালিব


 কোরায়শি সর্দার মহান,


আখেরি নবির না-আসা বাণীর দূত নকিব


 করিল গো আজ মহাপ্রয়াণ।


মুকুটবিহীন মক্কার বাদশাহ আজি


 ফেলে গেল ধূলি সিংহাসন,


মক্কার ঘরে ঘরে ওঠে ক্রন্দন আজি,


 মাতমমাতম : শোক। করিছে শত্রুগণ।


ডাকিয়া পুত্র আবুতালেবেরে মুত্তালিব


 দিয়াছিল সঁপি আহমদে,


জ্যেষ্ঠতাতের কোলে এল সব-হারা ‘হাবিব’,


 দিঘির কমল এল নদে।


মূলহারা ফুল স্রোতে ভেসে যায় নির্বিকার


 নাহি আর সুখ-দুঃখ লেশ,


শুধু জানে তারে ভাসিতে হইবে বারংবার


 এমনই অকূলে নিরুদ্দেশ!


রহস্য-লীলারসিক খোদার অন্ত নাই,


 কী জানি সাধিতে কোন সে কাজ


বন্ধুরে বন্ধুর পথে – বেদনা নাই


 ফুলেরে ফোটায় কাঁটার মাঝ।


নির্বেদ সে কি, নাহি গো দুঃখ ব্যথা কি তার?


 সৃষ্টি কি তার শুধু খেয়াল?


শুধু ভাঙাগড়া পুতুলখেলা কি নির্বিকার


 খেলে মহাশিশু চির সে কাল?


জগতেরে আলো দানিবে যে – কেন অন্ধকার


 তার চারপাশে ঘিরিয়া রয়?


সব শোকে দিবে শান্তি যে – শৈশব তাহার


 কেন এত শোক দুঃখময়?


কেহ তা জানে না, জানিবে না কেহ, সদুত্তর


 পাইবে না কেহ কোনো সেদিন,


শুধু রহস্য, জিজ্ঞাসা শুধু, চির-আড়াল


 বিস্ময় আদি অন্তহীন!


মাতৃগর্ভে শিশু যবে হল পিতৃহীন,


 পাইল না কভু পিতৃক্রোড়,


ষষ্ঠবরষে হারাল মাতায়, স্নেহ-বিহীন


 জীবনে কেবলই ঘাত কঠোর!


পুন অষ্ঠম বরষে হারাল পিতামহে


 সবহারা শিশু নিরাশ্রয়


পড়িল অকূল তরঙ্গাকুল ব্যথা-দহে,


 দশদিশি যেন মৃত্যুময়!


খেলে যে বেড়াবে ধুলা-কাদা লয়ে স্নেহনীড়ে,


 ব্যথার উপরে পেয়ে ব্যথা


বালক-বয়সে হল সে ধেয়ানি মরুতীরে –


 অতল অসীম নীরবতা


ছাইল আজিকে জীবন তাহার, একা বসি


 ভাবে, এ জীবন মৃত্যু হায়


কেন অকারণ? কেন কেঁদে ফেরে ক্রন্দসী


 এই আনন্দময় ধরায়?


পলাতক শিশু ঘরে নাহি রয়, নিষ্কারণ


 ঘুরিয়া বেড়ায় পথে পথে


খুঁজিয়া বেড়ায় মরু-কান্তার খেজুর বন


 অন্ধগুহায় পর্বতে,


সকল দিশার দিশারির দেখা পাবে বুঝি,


 হবে সমাধান সমস্যার,


‘আব-হায়াতের’আব-হায়াত : মৃতসঞ্জীবনী সুধা। মৃত্যু-অমৃত পাবে খুঁজি –


 খুঁজে পায়নি যা সেকান্দার।


এমনই করিয়া বেদনার পরে পেয়ে বেদন


 অল্প বয়সে শেষ নবি


ভাবে তারই কথা এই রহস্য যার সৃজন


 আঁধার যাহার – যার রবি!

No comments:
Write comments

Interested for our works and services?
Get more of our update !