Search This Blog

Theme images by MichaelJay. Powered by Blogger.

Blog Archive

Monday, November 14, 2016

ঝড়

[পশ্চিম তরঙ্গ]


  


ঝড় – ঝড় – ঝড় আমি – আমি ঝড় –


শন – শন – শনশন শন –ক্কড়ক্কড় ক্কড় –


কাঁদে মোর আগমনি আকাশ বাতাস বনানীতে।


জন্ম মোর পশ্চিমের অস্তগিরি-শিরে,


    যাত্রা মোর জন্মি আচম্বিতে


    প্রাচী-র অলক্ষ্য পথ-পানে


    মায়াবী দৈত্যশিশু আমি


    ছুটে চলি অনির্দেশ অনর্থ-সন্ধানে!


জন্মিয়াই হেরিনু, মোরে ঘিরি ক্ষতির অক্ষৌহিণী সেনা


প্রণমি বন্দিল – ‘প্রভু! তব সাথে আমাদের যুগে যুগে চেনা,


    মোরা তব আজ্ঞাবহ দাস –


প্রলয় তুফান বন্যা, মড়ক দুর্ভিক্ষ মহামারি সর্বনাশ!’


  


    বাজিল আকাশ-ঘণ্টা, বসুধা-কাঁসর;


মার্তণ্ডের ধূপদানি – মেঘ-বাষ্প-ধূমে-ধূমে ভরাল অম্বর!


উল্কার হাউই ছোটে, গ্রহ উপগ্রহ হতে ঘোষিল মঙ্গল;


        মহাসিন্ধু-শঙ্খে বাজে অভিশাপ-আগমনি কলকল কল কলকল কল কলকল কল!


    ‘জয় হে ভয়ংকর, জয় প্রলংকর’ নির্ঘোষি ভয়াল


    বন্দিল ত্রিকাল-ঋষি।


    ধ্যান-ভগ্ন রক্ত-আঁখি আশিস দানিল মহাকাল।


উল্লম্ফিয়া উঠিলাম আকাশের পানে তুলি বাহু,


 আমি নব রাহু!


হেরিলাম সেবারতা মহীয়সী মহালক্ষ্মী প্রকৃতির রূপ,


সহসা সে ভুলিয়াছে সেবা, আগমন-ভয়ে মোর


 প্রস্তর-শিখার সম নিশ্চল নিশ্চুপ!


অনুমানি যেন কোনো সর্বনাশা অমঙ্গল ভয়


জাগি আছে শিশুর শিয়র-পাশে ধ্যানমগ্না মাতা, শ্বাস নাহি বয়।


মনে হল ওই বুঝি হারা-মাতা মোর! মৌনা ওই জননীর


          শুভ্র শান্ত কোলে


– প্রহ্লাদকুলের আমি কাল-দৈত্য-শিশু –


 ঝাঁপাইয়া পড়িলাম ‘মা আমার’ বলে।


নাহি জানি কোন্ ফণিমনসার হলাহল-লোকে –


কোন্ বিষ-দীপ-জ্বালা সবুজ আলোকে –


নাগমাতা কদ্রু-গর্ভে জন্মেছি সহস্রফণা নাগ


ভীষণ তক্ষকশিশু! কোথা হয় নাগনাশী জন্মেজয়-যাগ –


উচ্চারিছে আকর্ষণ-মন্ত্র কোন্ গুণী –


জন্মান্তর-পার হতে ছুটে চলি আমি সেই মৃত্যু-ডাক শুনি!


মন্ত্র-তেজে পাংশু হয়ে ওঠে মোর হিংসা-বিষ-ক্রোধ-কৃষ্ণ প্রাণ,


আমার তুরীয় গতি – সে যে ওই অনাদি উদয় হতে


 হিংসাসর্প-যজ্ঞমন্ত্র-টান!


ছুটে চলি অনন্ত তক্ষক ঝড় –


 শন – শন – শনশন শন


সহসা কে তুমি এলে হে মর্ত্য-ইন্দ্রাণী মাতা,


 তব ওই ধূলি-আস্তরণ


    বিছায়ে আমার তরে জাতকের জন্মান্তর হতে?


লুকানু ও-অঞ্চল-আড়ালে, দাঁড়ালে আড়াল হয়ে মোর মৃত্যু-পথে!


    ব্যর্থ হল অঞ্চল-আড়াল; বহ্নি-আকর্ষণ


 মন্ত্র-তেজে ব্যাকুল ভীষণ


    রক্তে রক্তে বাজে মোর – শনশন শন –


 শন – শন – ওই শুন দূর –


দূরান্তর হতে মাগো, ডাকে মোরে অগ্নি-ঋষি বিষহরি সুর!


  


    জননী গো চলিলাম অনন্ত চঞ্চল,


বিষে তব নীল হল দেহ, বৃথা মা গো দাব-দাহে পুড়ালে অঞ্চল!


ছুটে চলি মহা-নাগ, রক্তে মোর শুনি আকর্ষণী,


          মমতা-জননী


 দাহে মোর পড়িল মুরছি;


আমি চলি প্রলয়-পথিক – দিকে দিকে মারী-মরু রচি।


  


ঝড় – ঝড় – ঝড় আমি – আমি ঝড় –


শন – শন – শনশন শন –ক্কড়ক্কড় ক্কড় –


কোলাহল-কল্লোলের হিল্লোল-হিন্দোল –


দুরন্ত দোলায় চড়ি – ‘দে দোল দে দোল’


উল্লাসে হাঁকিয়া বলি, তালি দিয়া মেঘে


উন্মদ উন্মাদ ঘোর তুফানিয়া বেগে!


ছুটে চলি ঝড় – গৃহ-হারা শান্তি-হারা বন্ধ-হারা ঝড় –


স্বেচ্ছাচার-ছন্দে নাচি !       ক্কড়ক্কড় ক্কড়


    কণ্ঠে মোর লুণ্ঠে ঘোর বজ্র-গিটকিরি,


মেঘ-বৃন্দাবনে মুহু      ছুটে মোর বিজুরির জ্বালা-পিচকিরি!


উড়ে সুখ-নীড়, পড়ে ছায়া-তরু,       নড়ে ভিত্তি রাজ-প্রাসাদের,


তুফান-তুরগ মোর উরগেন্দ্র-বেগে ধায়।


 আমি ছুটি অশান্ত-লোকের


প্রশান্ত-সাগর-শোষা উষ্ণশ্বাস টানি।


লোকে লোকে পড়ে যায় প্রলয়ের ত্রস্ত কানাকানি!


  


ঝড় – ঝড় – উড়ে চলি ঝড় মহাবায়-পঙ্খিরাজে চড়ি,


পড়-পড় আকাশের ঝোলা শামিয়ানা


 মম ধূলিধ্বজা সনে করে জড়াজড়ি!


প্রমত্ত সাগর-বারি – অশ্ব মম তুফানির খর ক্ষুর-বেগে


আন্দোলি আন্দোলি ওঠে। ফেনা ওঠে জেগে


    ঝটিকার কশা খেয়ে অনন্ত তরঙ্গ-মুখে তার!


আমি যেন সাপুড়িয়া          মারি মন্ত্র-মার–


ঢেউ-এর মোচড়ে তাই        মহাসিন্ধু-মুখে


জল-নাগ-নাগিনিরা আছাড়ি পিছাড়ি মরে ধুঁকে!


প্রিয়া মোর ঘূর্ণিবায়ু     বেদুইন-বালা


    চূর্ণি চলে ঝঞ্ঝা-চুর মম আগে আগে।


ঝরনা-ঝোরা তটিনীর নটিনি-নাচন-সুখ লাগে


শুষ্ক খড়কুটো ধূলি শীত-শীর্ণ বিদায়-পাতায়


ফাল্গুনী-পরশে তার। – আমার ধমকে নুয়ে যায়


বনস্পতির মহা মহিরুহ, শাল্মলি, পুন্নাগ, দেওদার,


        ধরি যবে তার


জাপটি পল্লব-ঝুঁটি, শাখা-শির ধরে দিই নাড়া;


গুমরি কাঁদিয়া ওঠে প্রণতা বনানী,


    চচ্চড় করে ওঠে পাহাড়ের খাড়া শির-দাঁড়া!


  


প্রিয়া মোর এলোমেলো গেয়ে গান আগে আগে চলে;


পাগলিনি কেশে ধূলি চোখে তার মায়া-মণি ঝলে।


ঘাগরির ঘূর্ণা তার ঘূর্ণি-ধাঁধা লাগায় নয়নালোকে মোর।


ঘূর্ণিবালা হাসির হররা হানি বলে – ‘মনোচোর।


  ধরো তো আমারে দেখি’ –


ত্রস্ত-বাস হাওয়া-পরি, বেণি তার দুলে ওঠে সুকঠিন মম ভালে ঠেকি।


    পাগলিনি মুঠি মুঠি ছুঁড়ে মারে রাঙা পথধূলি,


হানে গায় ঝরনা-কুলুকুচু, পদ্ম-বনে আলুথালু খোঁপা পড়ে খুলি!


    আমি ধাই পিছে তার দুরন্ত উল্লাসে;


লুকায় আলোর বিশ্ব চন্দ্র সূর্য তারা পদভর-ত্রাসে!


    দীর্ঘ রাজপথ-অজগর সংকুচিয়া ওঠে ক্ষণে ক্ষণে,


ধরণি-কূর্মপৃষ্ঠ দীর্ণ জীর্ণ হয়ে ওঠে মত্ত মোর প্রমত্ত ঘর্ষণে।


    পশ্চাতে ছুটিয়া আসে মেঘ ঐরাবত-সেনাদল


গজগতি-দোলা-ছন্দে; স্বরগে বাজে বাদল-মাদল!


    সপ্ত সাগর শোষি শুণ্ডে শুণ্ডে তারা–


উপুড় ধরণি-পৃষ্ঠে উগারে নিযুত লক্ষ বারি-তীর-ধারা।


    বয়ে যায় ধরা-ক্ষত-রসে


  সহস্র পঙ্কিল স্রোত-ধার।


    চণ্ডবৃষ্টি-প্রপাত-ধারা-ফুলে


  বরষার বুকে ঝলে জল-মালা-হার।


আমি ঝড়, হুল্লোড়ের সেনাপতি; খেলি মৃত্যু-খেলা


ঘূর্ণনীয়া প্রিয়া-সাথে। দুর্যোগের হুলাহুলি মেলা


  ধায় মম অশ্রান্ত পশ্চাতে!


মম প্রাণরঙ্গে মাতি নিখিলের শিখী-প্রাণ মুহু-মুহু মাতে!


শ্যাম স্বর্ণ পত্রে পুষ্পে কাঁপে তার অনন্ত কলাপ। –


দারুণ দাপটে মম জেগে ওঠে অগ্নিস্রাব-জ্বলন্ত-প্রলাপ


    ভূমিকম্প-জরজর থরথর ধরিত্রীর মুখে!


বাসুকি-মন্দার সম মন্থনে মম সিন্ধুতট ভরে ফেনা-থুকে।


জেগে ওঠে মম সেই সৃষ্টি-সিন্ধু-মন্থন-ব্যথায়


রবি শশী তারকার অনন্ত বুদবুদ! – উঠে ভেঙে যায়


    কত সৃষ্টি কত বিশ্ব আমার আনন্দ-গতিপথে।


শিবের সুন্দর ধ্রুব-আঁখি


যমের আরক্ত ঘোর মশাল-নয়ন-দীপ মম রথে।


জয়ধ্বনি বাজে মোর স্বর্গদূত ‘মিকাইলের’মিকাইল : স্বর্গীয় দূত, ইনি ঝড়-বৃষ্টির নিয়ন্তা। আতশি-পাখায়।


অনন্ত-বন্ধন-নাগ-শিরস্ত্রাণ শোভে শিরে! শিখী-চূড়ায় তায়


    শনির অশনি ওই ধূমকেতু-শিখা,


পশ্চাতে দুলিছে মোর অনন্ত আঁধার চিররাত্রি-যবনিকা!


জটা মোর নীহারিকাপুঞ্জ-ধূম পাটল পিঙ্গাস,


বহে তাহে রক্ত-গঙ্গা নিপীড়িত নিখিলের লোহিত নিষ্কাশ।


  


ঝড় – ঝড় – ঝড় আমি – আমি ঝড় –


    ক্কড়ক্কড় ক্কড় –


বজ্র-বায়ু দন্তে-দন্তে ঘর্ষি চলি ক্রোধে!


ধূলি-রক্ত বাহু মম বিন্ধ্যাচল সম রবিরশ্মি-পথ রোধে।


    ঝঞ্ঝনা-ঝাপটে মম


    ভীত কূর্ম সম


    সহসা সৃষ্টির খোলে নিয়তি লুকায়।


আমি ঝড়, জুলুমের জিঞ্জির-মঞ্জীরজিঞ্জির-মঞ্জীর : শিকলের নূপুর। বাজে ত্রস্ত মম পায়!


ধাক্কার ধমকে মম খান খান নিষিদ্ধের নিরুদ্ধ দুয়ার,


সাগরে বাড়ব লাগে,         মড়ক দুয়ার্কি ধরে আমার ধুয়ার!


কৈলাসে উল্লাস ঘোষে ডম্বরু ডিণ্ডিম


    দ্রিম দ্রিম দ্রিম!


    অম্বর-ডঙ্কার ডামাডোল


সৃজনের বুকে আনে অশ্রু-বন্যা ব্যথা-উতরোল।


ভাণ্ডারে সঞ্চিত মম দুর্বাসার হিংসা ক্রোধ শাপ।


ভীমা উগ্রচণ্ডা ফেলে উল্কারূপী অগ্নি-অশ্রু, সহিতে না পারি মম তাপ!


আমি ঝড়, পদতলে ‘আতঙ্ক’-কুঞ্জর, হস্তে মোর ‘মাভৈঃ’-অঙ্কুশ।


আমি বলি, ছুটে চলো প্রলয়ের লাল ঝাণ্ডা হাতে, –


    হে নবীন পরুষ পুরুষ!


স্কন্ধে তোলো উদ্ধত বিদ্রোহ-ধ্বজা; কণ্টক-অশঙ্ক রে নির্ভীক!


পুরুষ ক্রন্দন-জয়ী, – দুঃখ দেখে দুঃখ পায় – ধিক তারে ধিক


আমি বলি, বিশ্ব-গোলা নিয়ে খেলো লুফোলুফি খেলা!


বীর নিক বিপ্লবের লাল-ঘোড়া,


    ভীরু নিক পারে-ধাওয়া পলায়ন-ভেলা!


আমি বলি, প্রাণানন্দে পিয়ে নে রে বীর,


জীবন-রসনা দিয়া প্রাণ ভরে মৃত্যু-ঘন ক্ষীর!


আমি বলি, নরকের ‘নার’নার : অগ্নি।
মেখে নেয়ে আয় জ্বালা-কুণ্ড সূর্যের হাম্মামেহাম্মাম : স্নানাগার।


রৌদ্রের-চন্দন-শুচি, উঠে বসো গগনের বিপুল তাঞ্জামেতাঞ্জাম : শিবিকা, পালকি।!


    আমি ঝড় মহাশত্রু স্বস্তি-শান্তি-শ্রীর,


আমি বলি, শ্মশান-সুষুপ্তি শান্তি –


     জয়নাদ আমি অশান্তির।


  


     পশ্চিম হইতে পূর্বে ঝঞ্ঝনা-ঝাঁঝর


     ঝঞ্ঝা-জগঝম্প ঘোর – বাজায়ে চলেছি ঝড় –


     ঝনাৎ ঝনাৎ ঝন


ঝমরঝমরঝন ঝননঝননশন


  শনশনশন


  হুহু হুহু হুহু –


সহসা কম্পিত-কণ্ঠ-ক্রন্দন শুনি কার – ‘উহু! উহু উহু উহু!’


সজল কাজল-পক্ষ্ম কে সিক্তবসনা একা ভিজে –


বিরহিণী কপোতিনী, এলোকেশ কালোমেঘে পিঁজে।


নয়ন-গগনে তার নেমেছে বাদল, ভিজিয়াছে চোখের কাজল,


মলিন করেছে তার কালো আঁখি-তারা


    বায়ে-ওড়া কেতকীর পীত পরিমল!


এ কোন্ শ্যামলী পরি পুবের পরিস্থানে কেঁদে কেঁদে যায় –


    নবোদ্ভিন্ন কুঁড়ি-কদম্বের ঘন যৌবন-ব্যথায়!


    জেগেছে বালার বুকে এক বুক ব্যথা আর কথা,


কথা শুধু প্রাণে কাঁদে,


ব্যথা শুধু বুকে বেঁধে, মুখে ফোটে শুধু আকুলতা!


কদম্ব তমাল তাল পিয়াল-তলায়


দূর্বাদল-মখমলে শ্যামলী-আলতা তার মুছে মুছে যায়!


  বাঁধে বেণি কেয়া-কাঁটা বনে।


বিদেশিনি দেয়াশিনি একমনে দেয়া-ডাক শোনে!


  দাদুরির আদুরি কাজরি


শোনে আর আঁখি-মেঘ-কাজল গড়ায়ে


  দুখ-বারি পড়ে ঝরঝরি।


ঝিমঝিম রিমঝিম – রিমিরিমি রিম ঝিম


  বাজে পাঁইজোর –


কে তুমি পুরবি বালা? আর যেন নাহি পাই জোর


   চলা-পায়ে মোর, ও-বাজা আমারও বুকে বাজে।


ঝিল্লির ঝিমানি-ঝিনিঝিনি


  শুনি যেন মোর প্রতি রক্ত-বিন্দু-মাঝে!


  


আমি ঝড়? ঝড় আমি? – না, না, আমি বাদলের বায়!


  বন্ধু! ঝড় নাই কোথায়?


  ঝড় কোথা? কই? –


বিপ্লবের লাল-ঘোড়া ওই ডাকে ওই –


  ওই শোনো, শোনো তার হ্রেষার চিক্কুর,


        ওই তার ক্ষুর-হানা মেঘে! –


না, না, আজ যাই আমি, আবার আসিব ফিরে,


  হে বিদ্রোহী বন্ধু মোর! তুমি থেকো জেগে!


  তুমি রক্ষী এ রক্ত-অশ্বের,


হে বিদ্রোহী অন্তর্দেবতা! – শুনো শুনো মায়াবিনী ওই ডাকে ফের –


    পুবের হাওয়ায় –


যায় – যায় – সব ভেসে যায়


  পুবের হাওয়ায় –


        হায়! –

No comments:
Write comments

Interested for our works and services?
Get more of our update !